বংশগতি এবং কয়েকটি সাধারণ জিনগত রোগ



 বংশগতি এবং কয়েকটি সাধারণ জিনগত রোগ


১. বংশগতির জনক কাকে বলা হয়?

উঃ গ্রেগর যোহান মেণ্ডেলকে।

২. মেণ্ডেলের সুত্রগুলি কী নামে পরিচিত?

উঃ মেণ্ডেলবাদ নামে পরিচিত।

৩. কানের লতি কয় প্রকারের হয়?

উঃ দুই প্রকারের হয়। মুক্ত কানের লতি ও যুক্ত কানের লতি।

৪. সমসংস্থ ক্রোমোজোমের নির্দিষ্ট বিন্দুতে অবস্থিত বিপরীত বৈশিষ্ট্য নিয়ন্ত্রক উপাদানকে কী বলে?

উঃ অ্যালিল।

৫. বংশগতির একক কী?

উঃ জিন।

৬. মেণ্ডেলবাদ কাকে বলে?

উঃ বংশগতি সংক্রান্ত মেণ্ডেলের মৌলিক সূত্রগুলিকে (পৃথকভবন সূত্র ও স্বাধীন সঞ্চরণ সূত্র) মেণ্ডেলবাদ বলে।

৭. বংশগতি কাকে বলে?

উঃ যে প্রক্রিয়ায় পিতা-মাতার বা জনিতৃর চারিত্রিক বৈশিষ্ট্যগুলি বংশপরম্পরা সন্তান-সন্ততিতে বা অপত্যের দেহে সঞ্চারিত হয়, তাকে বংশগতি বা হেরিডিটি বলে।

৮. প্রকরণ কাকে বলে?

উঃ জিনের মাধ্যমে বা পরিবেশের প্রভাবজনিত কারণে একই প্রজাতিভুক্ত জীবদের চারিত্রিক বৈশিষ্ট্যের যে পার্থক্য লক্ষ করা যায় তাকে ভেদ বা প্রকরণ বলে।

৯. লোকাস কাকে বলে?

উঃ ক্রোমোজোমের উপর যে স্থানে কোনো জিন অবস্থান করে সেই স্থানটিকে লোকাস বলে।

১০. মিউটেশান কাকে বলে?

উঃ জীবকোশের প্রোটোপ্লাজমের সংগঠনের আকস্মিক পরিবর্তন ঘটিয়ে নতুন প্রজাতির উৎপত্তি হওয়াকে মিউটেশান বা পরিব্যক্তি বলে।

১১. অ্যালিল কাকে বলে?

উঃ সমসংস্থ ক্রোমোজোমের নির্দিষ্ট বিন্দুতে যে দুটি জিন অবস্থান করে তাদের পরস্পরকে পরস্পরের অ্যালিল বলে।

১২. সংকরায়ণ কাকে বলে?

উঃ সাধারণভাবে কোনো চরিত্র সাপেক্ষে বিপরীত বৈশিষ্ট্যযুক্ত দুটি জীবের মিলনকে সংকরায়ণ বলে।

১৩. বিশুদ্ধ জীব ও সংকর জীব কাকে বলে?

উঃ দুটি সম বা অবিমিশ্র বৈশিষ্ট্য সম্পন্ন জীবের মিলনের ফলে যে জীবের সৃষ্টি হয় তাকে বিশুদ্ধ জীব বলে।

দুটি ভিন্ন বৈশিষ্ট্য সম্পন্ন জীবের মিলনের ফলে মিশ্র বৈশিষ্ট্যযুক্ত যে জীবের সৃষ্টি হয় তাকে সংকর জীব বলে।

১৪. জিনোটাইপ ও ফিনোটাইপ কাকে বলে?

উঃ কোনো জীবের চারিত্রিক বৈশিষ্ট্যের বাহ্যিক প্রকাশকে ফিনোটাইপ এবং জীবের জিনগত সমাহারের জন্য কোনো চরিত্রের প্রকাশকে জিনোটাইপ বলে।

১৫. প্রকট ও প্রছন্ন বৈশিষ্ট্য কাকে বলে?

উঃ যে বৈশিষ্ট্য বিপরীতধর্মী অন্য কোনো বৈশিষ্টের প্রকাশে বাধা দেয় কিন্তু নিজে প্রকাশ পায়, তাকে প্রকট বৈশিষ্ট্য বলে।

যে বৈশিষ্ট্য প্রকট বৈশিষ্ট্যের উপস্থিতিতে প্রকাশিত হয় না বা সুপ্ত অবস্থায় থাকে, তাকে প্রচ্ছন্ন বৈশিষ্ট্য বলে।

১৬. একসংকর জনন কাকে বলে?


উঃ একটি চরিত্রের জন্য বিপরীতধর্মী দুটি জীবের মিলনকে একসংকরায়ণ বা মনোহাইব্রিডাইজেশন বলে।

১৭. দ্বিসংকর জনন কাকে বলে?

উঃ দুটি চরিত্রের জন্য বিপরীতধর্মী দুটি জীবের মিলনকে দ্বি-সংকরায়ণ বা ডাইহাইব্রিডাইজেশান বলে।

১৮. অসম্পূর্ণ প্রকটতা কাকে বলে?


উঃ বেশিরভাগ উদ্ভিদ ও প্রাণীতে বিপরীতধর্মী বৈশিষ্ট্যের মধ্যে প্রকট জনের বহিঃপ্রকাশ ঘটলেও বিশেষ কিছু ক্ষেত্রে, যেমন – সন্ধ্যামালতি উদ্ভিদে প্রকটতা প্রকাশ পায় না। প্রকটতার অসম্পূর্ণ প্রকাশ ঘটে। একে অসম্পূর্ণ প্রকটতা বলে।

১৯. মেণ্ডেল কী কারণে তার পরীক্ষার জন্য মটর গাছকে নির্বাচিত করেছিলেন?

উঃ ১। মটর গাছ দ্রুত বংশবিস্তারে সক্ষম, তাই অল্প সময়ের মধ্যে বংশানুক্রমে কয়েক পুরুষ ধরে পরীক্ষা-নিরীক্ষা করা সম্ভব।

২। মটর গাছ অল্প স্থানে সহজে বাগানে ফলানো যায়।

৩। মটর গাছে অনেক বিপরীতধর্মী বৈশিষ্ট্যের সমন্বয় ঘটার জন্য পরীক্ষা-নিরীক্ষা করার সুযোগ থাকে।

৪। মটর গাছ বংশপরম্পরায় নির্দিষ্ট চরিত্রগত বৈশিষ্ট্যসম্পন্ন খাঁটি অপত্য উৎপাদনে সক্ষম।

৫। মটর গাছের ফুল উভলিঙ্গ হওয়ায় মটর গাছে স্বপরাগযোগ ঘটানো সম্ভব।

৬। মটর গাছ স্বপরাগী হওয়ায় বাইরে থেকে কোনো অবাঞ্ছিত চরিত্র মিশে যাওয়ার সম্ভাবনা কম।

২০. মেণ্ডেলের একসংকর জননে ফিনোটাইপ ও জিনোটাইপ অনুপাত কী ছিল?

উঃ ফিনোটাইপ অনুপাত = ৩ লম্বা ( TT, Tt, Tt) : ১ বেঁটে (tt)

জিনোটাইপ অনুপাত= ১ বিশুদ্ধ লম্বা ( TT) : ২ সংকর লম্বা (Tt) : ১ বিশুদ্ধ বেঁটে (tt)

২১. মেণ্ডেলের দ্বিসংকর জননে ফিনোটাইপ ও জিনোটাইপ অনুপাত কী প্রকারের?

উঃ ফিনোটাইপ অনুপাত = ৯ : ৩ : ৩ : ১

জিনোটাইপ অনুপাত = ১ : ২ : ২ : ৪ : ১ : ২ :১ : ২ : ১

২২. মেণ্ডেলের পৃথকভবনের সূত্রটি লেখো।

উঃ কোনো জীবের একজোড়া বিপরীত বৈশিষ্ট্য জনিতৃ অনু থেকে অপত্য অনুতে সঞ্চারিত হওয়ার সময় একত্রিত হলেও বৈশিষ্ট্য বা অ্যালিলগুলি কখনও মিশ্রিত হয় না, বরং গ্যামেট গমনকালে বিপরীতধর্মী বৈশিষ্ট্যগুলি পরস্পর পৃথক হয়ে যায়।

২৩. মেণ্ডেলের স্বাধীন সঞ্চারণ সূত্রটি লেখো।

উঃ কোনো জীবের দুই বা ততোধিক যুগ্ম বিপরীতধর্মী বৈশিষ্ট্যগুলি জনিতৃ জনু থেকে অপত্য জনুতে সঞ্চারিত হওয়ার সময় একত্রিত হলেও শুধুমাত্র গ্যামেট গঠনকালে এরা যে পরস্পর থেকে পৃথক হয় তাই নয়, উপরন্তু প্রত্যেকটি বৈশিষ্ট্য স্বাধীনভাবে যে-কোনো বিপরীত বৈশিষ্ট্যের সঙ্গে সম্ভাব্য সকল প্রকার সমন্বয়ে সঞ্চারিত হয়।

২৪. মানুষের লিঙ্গ নির্ধারণে পিতার ভূমিকা গুরুত্বপূর্ণ কেন?

উঃ যেহেতু মাতার সেক্স ক্রোমোজোম XX প্রকারের, তাই তাদের একধরনের গ্যামেট X তৈরি হয়। অপরপক্ষে, পিতার সেক্স ক্রোমোজোম XY প্রকৃতির হওয়ায় তা থেকে দু-ধরনের গ্যামেট X ও Y তৈরি হয়। যখন পিতার X গ্যামেট মাতার X গ্যামেটের সঙ্গে মিলিত হয়, তখন কন্যা সন্তান (XX) সৃষ্টি হয়। আবার পিতার Y গ্যামেট যখন মাতার X গ্যামেটের সঙ্গে মিলিত হয়, তখন পুত্রসন্তান (XY) সৃষ্টি হয়। অতএব বলা যায় যে মানুষের লিঙ্গ নির্ধারণে পিতার ভূমিকাই প্রধান।

২৫. থ্যালাসেমিয়া কাকে বলে?

উঃ থ্যালাসেমিয়া একপ্রকারের প্রচ্ছন্ন অটোজোমাল জিন দ্বারা নিয়ন্ত্রিত লোহিত রক্তকণিকার বিশৃঙ্খলা, যেখানে এক বা একাধিক হিমোগ্লোবিন পলিপেপটাইড শৃঙ্খলের অনুপস্থিতি, হ্রাসপ্রাপ্ত সংশ্লেষ অথবা গঠনগত বিচ্যুতি যার ফলে তীব্র বা মৃদু রক্তাল্পতা, পাণ্ডুরোগ এবং হ্রস্ব জীবনকাল ইত্যাদি পরিলক্ষিত হয়।

২৬. থ্যালাসেমিয়া রোগের লক্ষণগুলি উল্লেখ করো।

উঃ ১। এই রোগের প্রধান লক্ষণ হল হিমোগ্লোবিন উতপাদনের ত্রুটি এবং রক্তাল্পতা, বিশেষ করে হিমোলাইটিক অ্যানিমিয়া রোগ হয়।

২। এছাড়া হিমোগ্লোবিনের পরিমাণ কমে যাওয়ায় লোহিতকণিকার আকার ছোট হয়ে যায়।

৩। অস্থি দুর্বল ও বিকৃত হয়।

৪। যকৃৎ ও প্লীহার বৃদ্ধি।

৫। কালচে মূত্র।

২৭. থ্যালাসেমিয়া রোগের কারণ উল্লেখ করো।

উঃ থ্যালাসেমিয়া দু-প্রকারের, যথা– α-থ্যালাসেমিয়া এবং β-থ্যালাসেমিয়া।

α-থ্যালাসেমিয়ার কারণঃ
জিনগত ত্রুটির জন্য যখন α-পলিপেপটাইড তৈরি হয় না বা কম পরিমাণে তৈরি হয় তখন এই প্রকার থ্যালাসেমিয়া দেখা যায়। হিমোগ্লোবিনের পলিপেপটাইড তৈরির জন্য ক্রোমোজোম 16-তে (অটোজোম) দুটি α-গ্লোবিন জিন থাকে। মানুষের 2টি ক্রোমোজোমে যখন দুটি করে α-পলিপেপটাইড তৈরির জিন থাকে তখন তাকে বলা হয় স্বাভাবিক অবস্থা। 16 নং ক্রোমোজোমের 2টি কিংবা 1টি α-জিন ক্ষয় হলে α-থালাসেমিয়া দেখা দেয়। যখন দুটি হোমোলোগাস ক্রোমোজোমের 1টিতে 2টি α-গ্লোবিন জিন নষ্ট হয়, তখন তাকে বলা হয় হেটারোজাইগাস অবস্থা। এই অবস্থায় α-হিমোগ্লোবিনের পরিমাণ অর্ধেক হয়ে যায়। এক্ষেত্রে মৃদু রক্তাল্পতা লক্ষণ প্রকাশিত হয়। একে থ্যালাসেমিয়া মাইনর বলে। কিন্তু দুটি হোমোলোগাস ক্রোমোজোমের উভয় α-জিন ক্ষয় হলে যে হোমোজাইগাস অবস্থার সৃষ্টি হয় তার কারণে α-পলিপেপটাইড তৈরি হয় না। এর ফল হিসেবে মারাত্মক রক্তাল্পতা সৃষ্টি হয়। একে থ্যালাসেমিয়া মেজর বলে।

β-থ্যালাসেমিয়ার কারণঃ
β-গ্লোবিন পলিপেপটাইড উৎপাদনের কোনোরকম ত্রুটির জন্য এই প্রকার থ্যালাসেমিয়া সৃষ্টি হয়। β-গ্লোবিন পলিপেপটাইড সংশ্লেষণ ও উৎপাদন কম হলে রোগীর কম রক্তাল্পতা দেখা যায়। কিন্তু β-গ্লোবিন পলিপেপটাইড উৎপাদন সম্পূর্ণভাবে বন্ধ হয়ে গেলে রক্তে হিমোগ্লোবিন আর থাকে না বললেই চলে। তখন রোগী মারাত্মক রক্তাল্পতায় ভোগে।

২৮. বর্ণান্ধতা কাকে বলে?

উঃ যে বৈশিষ্ট্যের বহিঃপ্রকাশে কোনো মানুষ লাল-সবুজ বর্ণের পার্থক্য বুঝতে পারে না বা বর্ণ চিনতে ভুল করে, সেই প্রকার অস্বাভাবিকতাকে বর্ণান্ধতা বলে।

২৯. বর্ণান্ধতার কারণ ও লক্ষণগুলি উল্লেখ করো।

উঃ কারণঃ বর্ণান্ধতা X ক্রোমোজোমে অবস্থিত একটি জিনের মিউটেশানের জন্য হয়।

লক্ষণঃ লাল-সবুজ বর্ণ চিনতে না পারা বা লাল-সবুজ বর্ণ দেখতে না পাওয়া।

৩০. হিমোফিলিয়া কাকে বলে?

উঃ মানুষের যে বংশগত রোগের ফলস্বরূপ আঘাতপ্রাপ্ত স্থান থেকে রক্তক্ষরণ বন্ধ হয় না, অর্থাৎ রক্ত তঞ্চিত হয় না তাকে হিমোফিলিয়া বলে।

৩১. হিমোফিলিয়া রোগের কারণ উল্লেখ করো।

উঃ হিমোফিলিয়া রোগ X ক্রোমোজোম বাহিত প্রচ্ছন্ন জিন দ্বারা উৎপন্ন হয়। হিমোফিলিয়া A রোগের জিন X ক্রোমোজোমের দীর্ঘ বাহুর প্রান্তভাগে অবস্থিত। প্রচ্ছন্ন জিন থাকার ফলে রক্ততঞ্চনের VII নম্বর ফ্যাক্টর কার্যকরী হয় না। হিমোফিলিয়া B রোগের জিনও X ক্রোমোজোমে অবস্থিত।

Post a Comment

0 Comments